শিক্ষা সফর ২০১৯

দাওয়াহ বিভাগের শিক্ষার্থীদের সেন্টমার্টিন কক্সবাজার ট্যুর সম্পন্ন

দাওয়াহ বিভাগের শিক্ষার্থীদের সেন্টমার্টিন কক্সবাজার ট্যুর সম্পন্ন

 

অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত তিন দিনের চট্টগ্রাম সেন্টমার্টিন কক্সবাজার শিক্ষা সফর। গত ২৭ ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাত ১২ টা আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম ক্যাম্পাস থেকে সফরের সূচনা। দাওয়াহ ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, সহকারী অধ্যাপক আ.ফ.ম নূরুজ্জামান স্যার সফরের চাকা ঘুরিয়ে দেন। সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর সামনে থেকে শুরু হওয়া সফর রাত একটায় চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় একটু বিরতি নেয়। সেখান থেকে সফরের কান্ডারী হিসেবে যোগ দেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আমিনুল হক। সফরের বাস একটানা চলতে থাকে টেকনাফের উদ্দেশ্যে। মাঝে অবশ্য ফজরের সালাতের বিরতি ছিল। খুব সকালেই হ্নিলা পৌছে নাস্তা। এরপর ছুটে চলা টেকনাফ ঘাটে। যেখান থেকে সবাই যাবেন সেন্টমার্টিন। ঠিক নয়টার আগেই পৌছে গেল আমাদের বাস। পরিবেশ খুব শান্ত। রোদ্রকোজ্জল সকাল। সকলের মনে আনন্দের দোল। বাস থেকেই নেমেই শুনা গেল একটি সংবাদ। যে সংবাদের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। খবর এলো, আজকে কোনো জাহাজে কেউ সেন্টমার্টিন যেতে পারবেন না। জাহাজগুলো শুধু খালি যাবে সেখানে আটকে পড়া লোকগুলো আনতে। সকলের কপালে ভাজ। একি শুনছি। আকাশের কোথাও মেঘের আলামত নেই। নেই বাতাসের ধমকা। সূর্য্টা সবাইকে জানান দিচ্ছে আজকের দিনটা কেমন যাবে। তারপরও পুলিশ বেচারারা গো ধরে বসে আছেন। উপরের নাকি নির্দেশ! তিন নম্বর বিপদ সঙ্কেত না প্রত্যাহার করা ছাড়া কোনো ভ্রমণকারী সেন্টমার্টিন যেতে পারবেন না। কোনো তৈল মালিশে কাজ হচ্ছে না। রোবটের মতো তারা। কোনো যুক্তি, রেফারেন্স কিচ্ছুতেই তাদের মন গলছে না। অগত্যা ঘাট ছেড়ে একরাশ নিরাশা নিয়ে ইনানী বীচের উদ্দেশ্যে রওয়ানা। টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে যেতে হবে। টেকনাফ শহরে গিয়ে সিদ্ধান্ত হলো, কিছু নাস্তা করে নেব। নাস্তা আনতে আনতে আবার সিদ্ধান্ত বদল। নাহ মেরিন ড্রাইভ সড়কে যাব না। যে পথে এসেছিলাম সেই পথে কক্সবাজার যাব। সন্ধ্যায় সাগর পাড়ে আনন্দ হবে। সেটা যেন আর মিছ না যায়।

টেকনাফ থেকে গাড়ি ঘুরাতেই ছেলেরা সবাই বলাবলি করতে লাগলেন, ঘাটের সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছি আবার একটু চেষ্টা করে দেখি যদি সেন্টমার্টিন যাওয়া যায়। ঘড়িতে তখন একটা বাজবে বাজবে ভাব। টিম লিডারকে পাঠানো হলো। একটু পরে এক চিলতে হাসি দিয়ে বান্না সাহেব বললেন, আল্লাহ কপালে লেখলে সেন্টমার্টিন যাওয়া হতেও পারে। সবাই দোয়া করেন। এই কথা শুনা মাত্র সবাই যে চিৎকার। আব্দুল্লাহ আল মামুনের চিৎকারটা একটু বেশিই শোনা যাচ্ছিল। এরপর ঘটেছে অনেক নাটকীয়তা। দেড়টার দিকে খবর এলো, এক মিনিটেই সবাইকে কেয়ারি জাহাজে পৌছতে হবে। না হয় জাহাজ মিছ। সবাই এখন পাগলের মতো ছুটাছুটি করছে। কে কার আগে জাহাজে উঠতে পারে চলছে তার পাল্লা। সবাই জাহাজে উঠে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছে আর জাহাজের এপাশে ওপাশে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন বিশ্ব জয় করে ফেলেছেন সবাই। ঘুমহীন রাত আর দিনভর টেনশনের পরও শরীরগুলো সব তাজা হয়ে উঠেছে জাহাজে উঠে সাগরের ঢেউ আর গাংচিল পাখির কলকাকলিতে। সাড়ে চারটার দিকে জাহাজ পৌছে গেল সেন্টমার্টিন। আহা কী দেখছি আমরা। সেন্টমার্টিন ঘাটে হাজার হাজার নারী পুরুষ চাতকের মতো অপেক্ষা করছেন টেকনাফ ফেরার জন্য। তারা গত তিন দিন আটকা পড়েছিলেন সেখানে বৈরী আবহাওয়ার কারনে। 


আমরা সবাই জাহাজ থেকে নেমে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য একটা হোটেলে প্রবেশ করলাম। সবাই উডুক্কু মাছ ফ্রাই দিয়ে পেট পুরে খেলাম। এরপর সবাই গেলাম রিসোর্টে। তখন সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। একদম সাগর লাগোয়া ছিমছাম রিসোর্ট। রুমে ব্যাগ রেখেই কেউ দোলনায় গা হেলিয়ে দিলেন কেউবা ছুটে গেলেন সাগর পাড়ে। সন্ধ্র্যার পর আমিন স্যার ঘোষণা দিলেন, রাত দশটায় ফিশ বারবি কিউ হবে। এরপর হবে কুইজ কম্পিটিশন। পরাটা আর ফিশ ফ্রাই দিয়ে রাতের ডিনার চললো সেই রকম। তাহসিন শিহাব নিজের বড়শি দিয়ে কোরাল মাছ ধরেছে সে মাছও যোগ হলো বারবিকিউ পার্টিতে।

ঘড়ির কাটা তখন এগারোটা। এরপর শুরু হলো কুইজ কম্পিটিশন। আমিন স্যার শুরু করলেন। মোট পনেরোটি প্রশ্ন করলেন। প্রশ্নগুলো ছিলো খুবই সুন্দর। প্রথমেই সেন্টমার্টিনের ইতিহাস দিয়ে এরপর চলে গেলেন কুরআন হাদিসের পাতায়। সবাই উপভোগ করলেন। দুজন পাচটি করে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সমান হলেন। আর চারজন একটি করে উত্তর দিয়েছিলেন। সকলের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। রাত বারোটায় সবাইকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে ঘুমাতে যেতে বলা হলো। আরো বলা হলো, ফজরের নামাজ একসাথে মসজিদে পড়তে হবে। ফজর নামাজ বাদ ছোট্ট একটা দারস হবে। দারসের বিষয়বস্তু হলো, “সফরের তাৎপর্ও ও শিক্ষা : ইসলামী দৃষ্টিকোণ”। ফজরের নামাজের পর চেয়ার নিয়ে সাগরের একদম কাছে দারসের স্থান নির্ধারণ করা হলো। যেখানে ঢেউগুলো সব পায়ে আছড়ে পড়ে। আমিন স্যার সাবলীলভাবে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সফর সম্পর্কে বললেন। সবাই চাতক পাখির মতো শুনলেন। তিনি বললেন, সফর মানেই অনেক কিছু শেখা। সফরের মাধ্যমে মানুষ ধনী হতে পারে। সেই ধন জ্ঞানের, সংস্কৃতির ও সভ্যতার। এমনকি পয়সাও অর্জন হয় সফরের মাধ্যমে। এ প্রসংগে নবী সা: একটি হাদিসও বলেন তিনি। سافروا واستغنوا কথাটি বলেছেন প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা.। যার অর্থ হলো, তোমরা সফর করো এবং ধনী হও। 
এরপর আকিব হাত তুলে বললেন, স্যার আজকে আমরা সবাই সাইক্লিং করবো। আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আপনার সাইকেলের ভাড়াটা আমি পে করবো। এমন সুযোগ আমিন স্যার মিস করার লোক নন। তিনি বললেন, আজকে সবাই সাইকেল চালাবো, অনেক মজা হবে। সবাই দৌড় দিলেন সাইকেল আনতে। ঘন্টা তিরিশ টাকা মূল্যে তিরিশ খানা সাইকেল আনা হলো। এরপর যা হলো তা ইতিহাস। সবাই সাইকেল চালালেন সমুদ্র উপকূলে। আমিন স্যারও সাইকেল চালালেন আর সবার আবদার রক্ষা করলেন ছবি তুলে। 


এরপর নাস্তার পালা। ভুনা খেচুরি কার না ভালো লাগে। পেট ভরে সবাই খেয়ে এখন ছেরা দ্বীপে যাওয়ার অপেক্ষা। বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে ছেরা দ্বীপে রওয়ানা। শীহাব বরশিটা এবারও সাথে রেখেছেন। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে গিয়ে যদি মাছ ধরা যায়! বিশ মিনিটে পৌছে গেলাম ছেরা দ্বীপ। ঘাটে পৌছেই শিহাব বরশি ফেললেন সাগরে। ও মা! বড় এক কোরাল মাছ চলে এলো। সবাই আনন্দ করছে। শিহাবের লোভ আরো বেড়ে গেল। পাচ পাচটি মাছ শিকার করলো এ যাত্রা। ছেরা দ্বীপ আসলেই অনেক সুন্দর। সামান্য ঘুরাঘুরি করে দুপুর একটায় ফিরে এলাম সেন্টমার্টিন। সেন্টমার্টিন এসে সবাই এবার নেমে পড়লেন নতুন প্রোগ্রামে। আমিন স্যার আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। সবাই পলিথিন ব্যাগ নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে গেলেন। যাদের গ্রুপ বেশী ময়লা পলিথিনে তুলবেন তাদের জন্য পুরস্কার। সবাই পাল্লা দিয়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে ক্লিন করতে নেমেছেন। মিছিল হচ্ছে, ক্লিন ক্লিন সেন্টমার্টিন ক্লিন। মিছিলের সারিতে সাধারণ মানুষও যোগ দিয়েছেন। প্রতিযোগিতার সাথে ক্লিন করা হলো দ্বীপের কিছু অংশ। এই ক্লিন প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল জন সাধারণকে দ্বীপকে ক্লিন রাখার জন্য উৎসাহ দেয়া।
এরপর সবাই আবার রিসোর্টে গিয়ে এক ঘন্টায় গোছল এবং দুপুরের খাবার সেরে টেকনাফ ফেরার জন্য কেয়ারি সিন্দাবাদ জাহাজ ধরার জন্য ছুটলেন। বিকাল তিনটায় জাহাজ ছেড়ে দেয়। সবার মন উৎফুল্ল। সাগরের নীল পানি সবাইকে পাগল করে ফেলে। সাগরের উত্তাল ঢেউ আর গাংচিল পাখির ছুটাছুটা যে কাউকে আকৃষ্ট করবে। 
টেকনাফ পৌছতে মাগরিব প্রায়। এরপর কক্সবাজার যাত্রা। রাত দশটা নাগাদ পৌছে গেলাম কক্সবাজার। দাওয়াহ বিভাগের অ্যালামনি কাওছার আহমদ আমাদের বরণ করে নিলেন। সেখানে রাত কাটিয়ে সাত সকালে চলে গেলাম কক্সবাজার সী বিচে। প্রথমেই ফুটবল খেলা। সকাল নয়টা থেকে দুপুর বারোটা পর্ন্ত চললো সাগরের পানিতে ইচ্ছে মতো সাতার ও খেলা। দুপুর ১ টায় কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরেন্ট বাবুর্চিতে দুপুরের খাবার খেতে গেলাম। খুব সুস্বাদু খাবার খেলাম সেখানে। এরপর ছুটে গেলাম রেডিয়ান্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড ভিজিট করতে। যেখানে হরেক রকম মাছ আছে। তিন তলা বিশিষ্টি বিশাল এই অ্যাকুরিয়াম সত্যিই অসাধারণ। সেখানে থ্রিডি মুভি দেখারও সুযোগ কেউ মিস করেনি। এরপর সবাই তিন তলায় রেস্টুরেন্টে চলে গেলেন। সেখানে তুর্কী গেস্ট মোহাম্মদ মোস্তফা অপেক্ষা করছিলেন। আমিন স্যারের নেতৃত্বে তুর্কী মেহমানদের সাথে মতবিনিময় হলো কিছুক্ষণ। এরপর দাওয়াহ অ্যালামনি মোহাম্মদ আইয়ুব ভাইয়ের সাথে গল্প চললো। তিনি বললেন, দাওয়াহ বিভাগ তাকে অনেক উচুতে নিয়ে গেছে। তোমাদের সবাইকে অনেক বড় হতে হবে। এরপর তিনি আইসক্রিম দিয়ে সবাইকে আপ্যায়ন করালেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আমরা তাকে দাওয়াহ বিভাগের ক্যালেন্ডার ও ডায়েরি উপহার দিলাম। এরপর ছুটে গেলাম সুগন্ধা শপিং করতে। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আবার ক্যাম্পাসে ফেরার জন্য রওয়ানা দিলাম.......এমন সুন্দর একটি সফর দাওয়াহ বিভাগ উপহার দিয়েছে যা অনেক দিন আমাদের মনে থাকবে......

Recent News